লোকের কথায় কান দিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছেন নাতো?

করিতে পারি না কাজ, সদা ভয়,সদা লাজ সংশয়ে সংকল্প সদা টলে, পাছে লোকে কিছু বলে।


কামিনী রায় তার বিখ্যাত কবিতা 'পাছে লোকে কিছু বলে'এর মাধ্যমে আমাদের জীবনে পিছিয়ে থাকার কিছু কারণ তুলে ধরেছেন।

আমাদের সমাজে মানুষের কথাকে প্রয়োজনের থেকেও বেশি গুরুত্ব দেয়ার ব্যাপারটা প্রচলিত।মানুষ কি বলবে,অন্যরা কি ভাববে,সমাজ কি বলবে ইত্যাদি ইত্যাদি চিন্তা করে অনেকেই নিজের ইচ্ছাকে মাটিচাপা দিয়ে দেয়। তাই মানুষের কথাকে গুরুত্ব একটু কম দিতে হবে আর নিজেকে বেশি।

হার্ভার্ডের সমাবর্তনে দেয়া এক বক্তব্যে অস্কারজয়ী অভিনেত্রী নাটালি পোর্টম্যান বলেছিলেন, তিনি যেদিন প্রথম হার্ভার্ডে পা রাখেন সেদিন আলাদা আলাদা পাঁচজন শিক্ষার্থী তাকে বলেছিলো তারা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি হবেন। তিনি যেন তাদের কথা মনে রাখেন। এই পাঁচজন শিক্ষার্থী হলেন মার্কো রুবিও, টেড ক্রুজ, বার্নি স্যান্ডার্স, বারাক ওবামা এবং হিলারি ক্লিনটন, যারা সকলেই পরবর্তীতে সফল রাজনীতিবিদ হয়েছেন এবং এদের মধ্যে দু'জন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিও হয়েছেন। একেই বলে আত্মবিশ্বাস। লোকে কি বলবে তারা ভাবেনি, নিজের বিশ্বাসে তারা ছিলো অটল। আর নিজের প্রতি এই বিশ্বাসই তাদেরকে সফল করেছে।

আমরা অনেক সময়েই নিজের পছন্দের কাজটা করিনা এই ভেবে যে, ঠিকমতো না করতে পারলে হয়তো লোকে হাসবে, পিছে কানাঘুষো করবে। অথচ লোকের কথা না ভেবে কাজটা করে ফেললে হয়তো দারুণ কিছু হয়ে যেতে পারতো। এই যে লোকের কথা ভেবে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা, এটাই আমাদের জাতি হিসেবে পিছিয়ে পড়ার অন্যতম একটি কারণ। আর আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষেরও স্বভাব অন্যের জীবনযাপনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। নিজের জীবন থেকে পরের জীবনের প্রতি আগ্রহ বেশি এদের। এভাবে যে নিজেকেই অসুখী করা হয় তা কয়জনই বা বোঝে!

ভাবুন তো, মাত্র ১৪ বছর বয়সে মা হওয়া, ওপরা উইনফ্রে যদি লোকে কি বলবে ভেবে থেমে যেতেন তবে কি তিনি ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় মার্কিন উপস্থাপক হতে পারতেন! পৃথিবীর প্রভাবশালী ও ধনী নারীদের মধ্যে একজন ওপরা উইনফ্রের জীবন সহজ ছিলোনা একদমই। কিশোরী বয়সে মা হওয়া, নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে শারীরিক বঞ্চনার শিকার হওয়া ওপরা হেরে যাওয়াদের দলে ছিলেন না। নিজের ভাগ্যকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি একে একে সফলতার সিড়ি চড়ে গেছেন। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে সফল এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিরা কখনোই তাদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে বিশেষ পাত্তা দেননি, দিলে হয়তো আজ তারা যেখানে আছেন সেখানে থাকা হতোনা।

আসলে আমরা নিজেকে যতটা জানি ততটা আমাদের আশেপাশের মানুষ কি আমাদের জানে? তারা আমাদের জীবনযাপনের ধরণ দেখে আমাদের সমন্ধে ধারণা করে মাত্র! সেই ধারণা সবসময় সঠিক নাও হতে পারে৷ তাই তাদের মতামতকে নিজের মতামত থেকেও বেশি গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই। নিজের জন্য কি সঠিক তা আমাদের নিজেকেই খুঁজে বের করতে হবে।

সবসময় যে কাউকে তোয়াক্কা না করে শুধু নিজের মনমর্জি মতোই চলতে হবে ব্যাপারটা আসলে এমন নয়। ব্যাপারটা হচ্ছে অন্যের কথা শুনতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে না ফেলা, নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়ে না ফেলা। আমাদের প্রিয়, অপ্রিয় সবার কথাই আমরা শুনবো কিন্তু শুধু তাদের কথার ভিত্তিতেই জীবনের সিদ্ধান্ত নেয়া ভুল। মানুষ কি বলবে,এই ভেবে নিজের সৃজনশীলতা গুটিয়ে নেয়া ভুল। আপনার ব্যর্থতায় আপনাকে নিয়ে যেই মানুষগুলো সমালোচনা করেছিলো, সফলতা আসলেই তাদের সমালোচনা প্রশংসায় বদলাতে সময় লাগবেনা। মানুষ আপনার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বারবার বদলাবে। যেটা বদলানো যাবেনা সেটা হচ্ছে নিজের প্রতি নিজের বিশ্বাস, আস্থা।জীবনের হাল আমাদেরকে নিজেদের হাতেই রাখতে হবে, হাল অন্যের হাতে ছেড়ে দিলে আমরা হয়তো কোনো একটা গন্তব্যে পৌছাব,কিন্তু সেই গন্তব্য আমাদের কাঙ্খিত গন্তব্য হওয়ার সম্ভবনা একেবারেই কমে যাবে। তাই চলুন উপরের কবিতাটি এভাবে

নিজের জীবনে প্রয়োগ করি- করিতে পারি সকল কাজ, নাহি ভয়,নাহি লাজ সংশয়ে সংকল্প নাহি টলে, পাছে লোকে যাই বলে।

এতেও কাজ না হলে সিভি রাইটিং বিশেষজ্ঞ আবিদ নিয়াজ এর কথাটা মনে রাখতে পারেন- লোকে যা ভাববে,তা যদি আপনিই ভাবেন তাহলে লোকে ভাববে কি?

88 views0 comments